ঐতিহ্যবাহী গম্ভীরা গানের শিল্পী ও রচয়িতা

0
10

বরেন্দ্র অঞ্চলের বহত্তর রাজশাহী জেলায় প্রচলিত এক শ্রেণীর লোকসংগীতের নাম ‘গম্ভীরা’। ‘গম্ভীরা’ শব্দটির অর্থ নির্ণয়ের চেষ্টা করা হলেও আজ পর্যন্ত তার অর্থ সস্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। পশ্চিম বাংলার বিশিষ্ট ফোকলোর গবেষক ড. প্রদ্যোৎ ঘোষ তার ‘লোকসংগীতঃ গম্ভীরা’ শীর্ষক গ্রন্থে শব্দটির বৎপত্তিগত যে অর্থ নির্ণয় করেছেন তা হচ্ছে- গম্ভীরা (গম্ভীর মল)

১. পরীধামে কাশীমিশ্রের ভবনে চৈতন্যদেবের বাসস্থান নিভত গভীর প্রকোষ্ঠ, অলিন্দের পর            দালান,তার ভেতরে ক্ষদ্র গহ।
“গম্ভীরা ভিতরে রাত্রে নাহি নিদ্রা লব” (চৈতন্য চরিতামত – ৩১৩)
গম্ভীরাতে গোসাঞি প্রভকে শোয়াইল” (চৈতন্য চরিতামত – ৩৫০)
২. জগন্নাথ দেবের শয়ন মন্দির গম্ভীর। “গম্ভীরা কক্ষে অন্ধকার অতি গম্ভীরা কহরে জ্বলে প্রদীপ        সন্ততি” (চৈতন্য চরিতামত – ৩০৩)
৩. গ্রাম্য দেবতার স্থান (দিনাজপর)।
৪. শিবের মন্দির, গাজন ঘর, গাজন উৎসব।

     অবশ্য অন্ধকার প্রকোষ্ঠ বা ক্ষদ্র প্রকোষ্ঠ সম্পর্কে অন্যান্য গবেষকও একমত। কারণ মধ্যযগের অনেক কাব্যে এই অর্থে “গম্ভীরা” শব্দটির অনেক প্রমাণ মেলে। তবে আমাদের আলোচ্য “গম্ভীরা” শব্দের সাথে গহ, মন্দির বা তাদের অন্তঃপ্রকোষ্ঠের কোন সম্পর্ক নেই। গম্ভীরা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে কোন কোন গবেষক শিবমন্দির অর্থেই শব্দটি গ্রহণ করার পক্ষপাতি। কারণ শিব বা মহাদেবের অপর নাম গম্ভীর। আর সংস্কত “গম্ভীর” শব্দ থেকেই  “গম্ভীরা” শব্দটি এসেছে তা অনমান করা অসঙ্গত নয়। সতরাং চলিত কথায় এই মহাদেবের বন্দনা গীতই গম্ভীরা। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে গম্ভীরা এখন আর শিববন্দনা বা মহাদেবের মতো সম্পক্ত কোন লোকাচারকে বোঝানো হয় না। গম্ভীরা বলতে এখন একটা বিশেষ জনপ্রিয় লোকসংগীতকে বোঝায়। এই লোকসংগীতের উদ্দেশ্য শিব বন্দনা নয়, সমাজ সমালোচনা। আর তাই জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এ সংগীত আজ সবার প্রিয়।
     উৎপত্তিঃ প্রাচীনকালে ‘গম্ভীরা’ পজা উৎসব হিসেবেই প্রচলিত ছিল এবং তার উদ্ভব প্রায় দেড় হাজার বছর পর্বে অনমান করা হয়। এ পজা সাধারণত শিব বা মহাদেবকে কেন্দ্রকরেই অনষ্ঠিত হতো যা শিবের গাজন নামে পরিচিত ছিল। পশ্চিম বাংলার মালদহ জেলার কোথাও কোথাও এখনও তার অস্তিত্ব টিকে আছে। ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য গম্ভীরা গানের সঙ্গে গাজনের সম্পক্ততা স্বীকার করতে রাজী নন। তার মতে, গম্ভীরা গানে দীর্ঘদিন ধরে মর্তি উপস্থাপন করার প্রথা প্রচলিত ছিল। তবও তার মতে গম্ভীরা লোকসংগীত ছাড়া আর কিছই নয়। আর এই লোকসংগীত উদ্ভবের পেছনে একটা বিশেষ জাতিগত এবং ভৌগোলিক পরিবেশগত প্রভাব রয়ে গেছে তা অস্বীকার করা যাবে না।
     ভৌগোলিক দিক দিয়ে এই সঙ্গীতাঞ্চল উত্তরবঙ্গ বা বরেন্দ্রভমির অন্তর্গত। এই অঞ্চলের উত্তরাংশ প্রধানত কোচ জাতি দ্বারা অধ্যষিত। কোচ জাতি ভারতের অতিপ্রাচীন আদিবাসী, রাঢ় অঞ্চলে যে অধিবাসী সমাজ ক্রমে ক্রমে হিন্দ ভাবাপন্ন হয়েছে, তার সাথে কোচ জাতির মৌলিক কোন সম্পর্ক নেই। রাঢ় দেশীয় আদিম অধিবাসী প্রধানত আদি অস্ত্রাল (Proto-Australiod) গোষ্ঠীভক্ত, কিন্তু উত্তরবঙ্গের আদিম অধিবাসী ইন্দো-মোঙ্গলয়েড গোষ্ঠীভক্ত, ইন্দো-মোঙ্গলয়েড অন্যান্য জাতির মতো পীতবর্ণ নয়, বরং কষ্ণবর্ণ। যদিও এরই পাশাপাশি পলিয়াদের চেহারায় পরিস্কার ইন্দোমোঙ্গলয়েড ছাপ বিদ্যমান। এই ইন্দো-মোঙ্গোলয়েড জাতির বিভিন্ন শাখার মধ্যে ‘গম্ভীরা উৎসব’ বা বাৎসরিক উপজাতীয় অধিবেশন (Tribal Council) উপলক্ষে সঙ্গীত ও নত্য প্রচলিত ছিল। শিবকে উপলক্ষ করেই সাধারণত বর্ষবিবরণী বা ‘বর্ষ পর্যালোচনা’ হিসেবে এগুলোর পরিবেশন হতো। এসব হতেই গম্ভীরা গানের উৎপত্তি বলে ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য মনে করেন। গবেষকবন্দ গম্ভীরা সম্পর্কে যে মতামতই ব্যক্ত করুন না কেন সার্বিক দিক বিশ্লেষণ করে আমরা দেখতে পাই যে, গম্ভীরা মলত পজা উৎসব হিসেবেই উদ্ভত হয়েছে।
     শ্রেণীবিন্যাসঃ মধ্যযগে কষ্টি কালচারের প্রধান অবলম্বন ছিল বিভিন্ন লৌকিক দেব-দেবীর গুণকীর্তন। বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন লোকিক দেব-দেবীকে কল্পনা করে পজা উৎসব হতো। নিজেদের সখ-দঃখ হাসি-কান্না, অভাব অভিযোগ, আনন্দ-বেদনা প্রভতি তাদের পাদপদ্মে নিবেদন করে প্রতিকারের আশায় বসে থাকতো। এইভাবে চন্ডী, মনসা, শীতলা প্রভতি লৌকিক দেবতা সম্পর্কে মানষের মনে বিশ্বাস গড়ে ওঠে। ধর্ম শুরু হয় এই প্রেক্ষাপটেই।
     শিব ও ধর্মঠাকর অভিন্ন কল্পিত হওয়ায় কোন কোন অঞ্চলে আদ্য নামেও পরিচিত। এ কারণে হরিদাস পালিত শিবের গাজনকে ‘আদ্যের গম্ভীরা’ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চলে তো নয়ই, এমনকি পশ্চিম বাংলার বহত্তর মালদহ জেলার কোথাও আদ্যের গম্ভীরার অস্তিত্ব পাওয়া যায় না।
     প্রাচীনকালে এসব কারণেই ‘গম্ভীরা’ দটো ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যথা-

১. শিবের গাজন বা আদ্যের গম্ভীরা
২. পালা গম্ভীরা বা গম্ভীরা গান।

     আদ্যের গম্ভীরা সাধারণত হিন্দ সমাজের প্রচলিত ও দেব-দেবীর বিষয় নিয়ে রচিত হতো। অন্যদিকে পালা গম্ভীরায় তৎকালীন সংঘটিত বিশেষ বিশেষ গুরুত্বপর্ণ ঘটনা স্থান পেত।
     গম্ভীরা গানের বিবর্তনঃ গম্ভীরা গানের উৎস মলত ‘বর্ষ বিবরণী’ বা বর্ষ পর্যালোচনা থেকেই। সারা বছর বিশেষ গুরুত্বপর্ণ ঘটনা বা সমস্যা, অভাব-অভিযোগ এতে স্থান পেত এবং মধ্যযগীয় সনাতন বিশ্বাসে শিবকে সখ-দঃখের নির্বিকার প্রতীক রূপে কল্পনা করে তার কাছে নিবেদন করা হতো। অর্থাৎ মানষ কখনই কোন সমস্যার সম্মখীন হয়েছে, প্রাকতিক দর্যোগ দেখা দিয়েছে, তখনই তার প্রতিকারার্থে সঙ্গীতের মাধ্যমে শিবের শরণ নিয়েছে। তাদের বিশ্বাস, এসব কিছই হয় শিবের ইচ্ছায়। শিবই সকল প্রকার সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনের দর্ভোগের একমাত্র কারণ। এখানে একটি দষ্টান্তের মাধ্যমে বিষয়টি পরিস্কার করা যেতে পারে –
শিব তোমার লীলাখেলা কর অবসান
বঝি বাচে না আর প্রাণ।
অনাবষ্টি কর‌্যা সষ্টি
মাটি করল্যা নষ্ট হে
দষ্টি থাকতে কষ্টি কর‌্যা
দেখছ নাকি কষ্ট হে
মিষ্ট কথায় তষ্ট কর‌্যা
শিষ্ট লোকের ইষ্ট মার‌্যা
করল্যা মোদের গুষ্টি ছাড়া।
শুন বলি পষ্ট কর‌্যা
তারপরে ম্যালেরিয়ায়
হলাম হালাকান,
বছি বাচে না আর জান।
অন্নদা মা ভিক্ষা তোমার
করবে নাকি দানা হে,
সময়কালে না হয়্যা জল
অসময়ে ফলল কফল।
(ও সব) মশরী কালাই গ্যালো ডব্যা
ক্ষেতের ফসল ম’ল
আম গ্যালো ছালা গ্যালো
ক্যামনে ধরি গান
বঝি বাচে না আর জান।
     এই গানটিতে প্রাকতিক দর্যোগের ফলে সষ্ট অভাবের কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে শিবের উদ্দেশ্যে। কারণ সরল কষক মনে করে, শিব যেমন দরিদ্র ও নিঃসহায়, তেমনি তিনি সকল কষক সমাজেও দারিদ্র্যের কারণ। তিনি ইচ্ছা করলেই সমাজের এই দঃসহ দঃখ দারিদ্র্যের অবসান করতে পারেন-
প্যাটেতে ভাত নাই, ও শিব, গোলাতে নাই ধান
কি দিয়্যা বাচাবো ও শিব ছেল্যা পিল্যার জান।
ও বঢ়া শিব দয়া করো
পরণে তেনা নাই ও শিব বরজে নাই পান।
কি দিয়্যা রাখিবো ও শিব মাইয়্যা লোকের মান
ও বোকা শিব দয়া করো।
     নিষ্ক্রিয়তা ও নির্বদ্ধিতার জন্য কষক-কবির নিকট শিব কপার পাত্র হয়েছেন। মধ্যযগের বাংলা সাহিত্যে দেবতার সাথে মানষের যে একটা সহজ সম্পর্কের পরিচয় পাওয়া যায় গম্ভীরা গানে তার ব্যত্যয় ঘটেনি।

বিশ শতকের প্রারম্ভে গম্ভীরা গানে শিব মর্তি তিরোহিত হয়। সে স্থান দখল করে মানবরূপী শিব। অর্থাৎ শিবের প্রতীকে একজন মানষকে দাড় করিয়ে তার কাছে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি উপস্থাপন করে ফরিয়াদ জানানো হতো। যেমন-

(তমি)           কেন উদাসী, কাশীবাসী, ওহে কাশীশ্বর।
             দনিয়াটা যায় রসাতল রক্ষা করো হর॥
             কামার, কমার, ছতার, চাষা
             ছাড়লো তার জাত ব্যবসা
             চাকরি লয়ে বাব হয়্যা ভাবছে কতো বড়।
             গায়ের মাটি শিল্প হলো মাটি
             বাংলার মাটি আছে খাটি
             কষি-শিল্প শিখাও মোদের
             (তমি) দেশকে তলে ধর।
             চাষ উন্নতি করতে হলে
             চলবে না আর পরানা চালে
             দেশ-বিদেশের নতন নিয়ম
             আমদানী সব করো।
             রং তামাসা টকীর গানে
             দেবতা গলায় উল বনে
             শিখাও মোদের ভক্তি মন্ত্র
             পজা-গঙ্গাধর।
     বিশ শতকের প্রারম্ভে রচিত গম্ভীরা থেকে শিবমর্তি তিরোহিত হলেও তখন পর্যন্ত তাতে শিব পজার প্রভাব বিদ্যমান থাকে। পরবর্তী সময়ে দই বিশ্বযদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসলীলার প্রেক্ষিতে সমাজ মানসে পরিবর্তন আসে। গম্ভীরা গানেও পরিবর্তনের ছোয়া লাগে। মানষ সচেতন হয়। তারা বটিশ সরকারের শোষণে অতিষ্ঠ হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। তাই তাদের গম্ভীরায় শিব আর মহাদেব না হয়ে, হয়ে ওঠে ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধি। তার সামনে শিল্পীরা ব্রিটিশ সরকারের সামগ্রিক দর্নীতির কথা তলে ধরতেন বলিষ্ঠতার সাথে। ফলে গম্ভীরা গান বর্ষ পর্যালোচনা বা বর্ষ বিবরণী উপস্থাপনার পরিবর্তে হয়ে ওঠে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অন্যতম মাধ্যম। ব্রিটিশ সরকারের সমালোচনায় মখর একটি গানের কিছ অংশ হচ্ছে-
             জমি-জমা চাষ করে যা ফসল উঠাই
             তহে মোদের কি স্বত্ব নাই?
             তমি ওজন করিয়া কাগজ ধরাইয়া
             গাড়ি করো বোঝ।
             ভারতের অর্জিত জিনিস তমি কর চালান
             আমরা ভারতের লোক খেটে মরি
             বাচে কিনা জান
             ধন্য তমি বদ্ধিমান।
     শিবের এই প্রতীকী পরিবর্তনের পেছন একটা চিত্তাকর্ষক ঘটনা রয়েছে। ড. প্রদ্যোত ঘোষ তার ‘লোকসংস্কতিঃ গম্ভীরা’ গ্রন্থে ঘটনাটি উদ্ধত করেছেন। ১৯২০-২৩  খ্রিস্টাব্দের কোন এক সময় কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি স্যার আশুতোষ মখোপাধ্যায়ের মালদহ আসার কথা ছিল। স্থানীয় প্রখ্যাত গম্ভীরা লেখক ও গায়ক মোহাম্মদ সফী মাষ্টার স্যার আশুতোষ অর্থাৎ শিবের সামনে গম্ভীরা গাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এই উদ্দেশ্য তিনি একজন পাত্রকে শিব সাজিয়ে আসরে হাজির করেন। কিন্তু অনিবার্য কারণবশত স্যার আশুতোষ মালদহে না আসায় তার এক প্রতিনিধি আসেন। তবও সফী মাষ্টার শিবকে উপস্থিত করে গান গেয়েছিলেন। গানটির অংশবিশেষ –
             হে দ্যাখ, হে দ্যাখ্ কারে ডাকতে
             কেডা এলো ভাইরে-
             ইনি কি স্যার আশুতোষ?
             হাইকোর্টের জজ
             গায়ে মাখা কেন ছাইরে?
     এ ঘটনার পর থেকে সব গম্ভীরায় শিব উপস্থিত হতে থাকেন, সর্বকালের হোতা সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে। সতরাং শিব চরিত্রকে সামন্ততান্ত্রিক চরিত্রের প্রতিভরূপে গম্ভীরাগানে উপস্থিত করা এবং তাকে জনপ্রিয় করে তোলার মলে সফী মাষ্টারের অবদান অনস্বীকার্য।
     ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর গম্ভীরা গানের পষ্ঠপোষক ও গায়েনরা মালদহ ত্যাগ করে এদেশে চলে আসেন। ফলে আদি উৎপত্তিস্থল মালদহে এ গানের চর্চা দারুনভাবে কমে যায়। তৎকালীন পর্ব পাকিস্তানের রাজশাহী জেলার চাপাইনবাবগঞ্জ মহকমায় গম্ভীরার ব্যাপক প্রসার ঘটতে তাকে। এতদাঞ্চলে গম্ভীরা গানের প্রবর্তণকারীদের মধ্যে যারা অগ্রপথিকের কাজ করেছিলেন তাদের মধ্যে শেখ সফিউর রহমান বা সফি মাষ্টার, মোহাম্মদ সোলায়মান মোক্তার, মোহাম্মদ মোহসীন আলী মোক্তার, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, মোহাম্মদ ফজলর রহমান, তৈয়ব আলী, লৎফল হক, মনিমল মাষ্টার প্রমখের নাম উল্লেখযোগ্য।
     বিভাগোত্তরকালে রাজশাহীর গম্ভীরা গানে শিবের অস্তিত্বের বিলপ্তি ঘটে এবং সে স্থান দখল করে নানা ও নাতি। নানা-নাতি সম্পর্কের মধ্য দিয়ে যত রস-রসিকতা চলতে পারে, ততটা অন্য কোন সম্পর্কে সম্ভব নয় বলেই সম্ভবত এই বিবর্তন।
     দেশ বিভাগের পর পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে দই ধারার গম্ভীরা গানের চর্চা অব্যাহত থাকে। পশ্চিমবঙ্গে পালা গম্ভীরা এবং বাংলাদেশে প্রচলিত ডয়েট গম্ভীরা (নানা-নাতীর গম্ভীরা) চর্চায় সদীর্ঘকাল ধরে অসংখ্য গুণী শিল্পী ও রচয়িতা গুরুত্বপর্ণ ভমিকা পালন করে আসছেন। তাদের অবদানে লোকসাহিত্যের এই সমদ্ধ ধারাটি ক্রমাগত অগ্রগতির দিকে অগ্রসর হয়েছে। আলোচ্য প্রবন্ধে আমি দই বাংলার সেই খ্যাতিমান গম্ভীরা শিল্পী ও রচয়িতাদের পরিচয় তলে ধরতে চেষ্টা করবো।
     কষ্ণধন দাস গোস্বামী (১৮০৮-১৯১০)ঃ ১৮০৮ সালে মালদহ জেলার আইহো গ্রামে এক বৈষ্ণব পরিবারে কষ্ণধন দাস গোস্বামীর জন্ম। তার গম্ভীরা গানগুলি সাহিত্যরস সমদ্ধ ও ঐতিহাসিক তথ্যসমদ্ধ। লেখাপড়া না জেনেও বাল্যকাল থেকেই তিনি গম্ভীরা গানের রচয়িতা ও সকণ্ঠের অধিকারী ছিলেন। বছর বছর গান রচনা ও রচনা করা গানের বিক্রয়লব্ধ অর্থে তার জীবন নির্বাহ হত। একবার বালক বয়সে বৈষ্ণব বেশে যখন তিনি ভিক্ষায় বেরিয়েছিলেন, তখন জনৈক ভৈরব তাকে দেখে রসিকচিত্তে পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে তিনি তখন তার তাৎক্ষণিক রচিত গম্ভীরা সংগীতের মাধ্যমে নিু গানের কলি দিয়ে প্রত্যত্তর দিয়েছিলেন।
             হামার নাম কিষ্ট দাস, শ্রীকষ্ণে দাস, আইহো গ্রামে বাড়ি,
             হামার বাবা জীবনকষ্ণ, মালা চন্দনধারী
             মা গৌরাঙ্গিনী, গর্ভধারিণী, মেয়ে পতি সেবা অধিকারিণী।
             হামার বয়স বঝি আট, বাবা পথি করে পাঠ,
             হামি বস্যা বস্যা শুনতক সব, ক’হলে কথা বাবা পাবে ব্যথা,
             তাই সদা থাকতক নীরব।
             বাবার কাছে ক,খ, গ, ঘ শিখ্যাছিন, এগারো বারোতে পথি ধর‌্যালিন
             শিশুবোধ পড়্যা পড়া করন শেষ, বাবা ধরিয়্যা দিলে বাবাজী বেশ।
     পরবর্তীকালে কষ্ণধন দাস গম্ভীরা গান ছাড়াও কবিগান, আলকাপ গান ও কীর্ত্তন গান রচনা করেন। বড়বড় কবিদলকে কবিযদ্ধে পরাজিত করেন। তারপর গম্ভীরা গান ও আলকাপ গানকে প্রচার করে নিজ রচনা গুণে সংগীত জগতকে এমনভাবে মাতিয়ে তোলেন যে, পরিণামে তিনি একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী গম্ভীরা শিল্পী ও গম্ভীরা গানের পেশাদার লেখকে পরিণত হন। তিনি গম্ভীরা গানের বিক্রয়বদ্ধ অর্থ দিয়ে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করতেন। ১৯১০ সালে তিনি পরলোকগমন করেন।
     সতীশচন্দ্র গুপ্ত ওরফে সতীশ কবিরাজ (১৮৮২-১৯৭৫)ঃ প্রখ্যাত গম্ভীরা রচয়িতা ও শিল্পী সতীশচন্দ্র গুপ্তওরফে সতীশ কবিরাজ ওরফে সতীশ ডাক্তার ১৮৮২ সালে মালদহে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম স্বর্গীয় রাধারমন গুপ্ত। তার প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা না থাকলেও তার গ্রন্থপাঠ ও বিদ্যাচর্চা ছিল আজীবন জাগরূক।
     সতীশ গুপ্ত যবক বয়সে ডাক্তার কালীপ্রসন্ন ব্যানার্জী ও ডাক্তার বৈকন্ঠ মখার্জীর কাছ থেকে এ্যালোপ্যাথী চিকিৎসা শিক্ষা করেন। এরই সাথে কবিরাজী চিকিৎসা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। এছাড়া সাবান তৈরী ও বিভিন্ন রং তৈরীর প্রক্রিয়া জানতেন তিনি। তবে চিকিৎসাই ছিল তার প্রধান পেশা।
     ছোট থেকেই সঙ্গীতের প্রতি তার প্রচ- আগ্রহ ছিল। প্রথমে পরেশ মালাকার এর যাত্রা দলে তিনি যোগদান করেন। সে দলের যন্ত্রশিল্পী ও সঙ্গীত রচয়িতা হিসেবে বেশ কয়েক বছর কাটানোর পর অপর একটি যাত্রা দলে যোগদান করেন। তবে যাত্রা দলের গীতিকার ও যন্ত্রশিল্পী হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেলেও তার প্রকত সাফল্য আসে গম্ভীরা গান রচনায়। তিনি পালাবন্দি গানও রচনা করেছেন অসংখ্য। মালদহের আঞ্চলিক ভাষায় তার গানই সবচেয়ে সার্থক। তার শব্দ চয়ন ও ছন্দ বিন্যাসে মসিয়ানা লক্ষনীয়।

একজন লোককবি হিসেবে সতীশ গুপ্ত কাব্যরত্মাকর উপাধি লাভ করেছিলেন। ১৯৭৩ সালে ‘সজনী’ গ্রন্থাগার প্রাঙ্গনে আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন লোকসংস্কতিবিদ ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য তাকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন। পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত লোকসঙ্গীত গবেষক ড. প্রদ্যোত ঘোষ এ সংবর্ধনা অনষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন।

                                                শিব-বন্দনা
             ঐ দ্যাখ্ ন্যাংটা বঢ়া সঙটা সাজ্যা ঢঙটা কোর‌্যা আছে বোস্যা।
             বঢ়া আস্ত খ্যাপা ভষম ল্যাপা বাঘের ছালটা পড়ছে খোস্যা।।
             আছে বোস্যো।
             ১.  বড়া ষাড়ে চোড়্যা এ্যালো দোর‌্যা গম্ভীরাতে পজা খ্যাতে।
                  ঐ দ্যাখ রদবোদ্যা ঐ বাশুয়া বলদ আসছে রে ভাই ক্যামন শুষ্যা।
                  আছে বোস্যা।
             ২.  বড়ার মাথায় ল্যাপটা আলাদ ভাপটা জটে সাপটা ফোস ফোসাছে।
                  আবার মাইয়া একটা তাইয়া কেমন, ঢেউ খ্যালাছে আছে রোস্যা।।
                  আছে বোস্যা।
             ৩.  ধৎতেরি ধতরার ফল কি সখ কোর‌্যা কেউ দ্যায়রে কানে।
                  [আবার] হরদম মখে বম বম বলি ভিক্ষার ঝলি কাধে কোস্যা।।
                  আছে বোস্যা।
             ৪.  আবার ভো ভো ভরং ভরং শিঙ্গা ডমরু বাজাছে বোস্যা।
                  ঐ দ্যাখ বোমকেশ জটাজট জালে আকাশে যেন পড়ছে হাইস্যা।
                  আছে বোস্যা।
             ৫.  আবার কপাল ফট্যা, আগুন ছট্যা, সারা দনিয়া করছে আলা।
                  গাজায় দম কি দিচ্ছেরে কম, কলকির ধয়া ফেরছে চষ্যা।
                  আছে বোস্যা।
             ৬.  ঐ দ্যাখ দদিকে দটা হুলকমখা সিদ্ধি ঘটছে তালে তালে।
                  আবার পালে পালে কচনী-বচনী, ভাঙ্গ-ধতরা খাওয়ায় ঘোস্যা।।
                  আছে বোস্যা।
             ৭.  দ্যাখেক ঝরর-মলর ঝলছে ভাস, হাড়ের-মালা ভরা গলা।
                  বড়া তাল বেতালে নত্য করে রাম নামে হোয়্যা বেহস্যা।।
                  আছে বোস্যা।
             ৮.  ভেরে সতীশ বলে পদতলে, ভক্তি বলে জড়েক আসন।
                  বঢ়ার এমনি শাসন, যমের ভাষণ আসে না এখানে পোষ্যা।।
                  গান
             (শাশুড়ী যগের পরিবর্তন দেখে ঠিক ভালভাবে নতন বৌ-এর নতন                       চালচলন
             গ্রহণ করতে না পেরে তার প্রতি তার মনোভাব প্রকাশ করে)
             ওটে লয়্যা বো, লয়্যা লয়্যা দেখছি সব জায়গা।
             ম্যাগ লয়্যা ভাতার লয়্যা
             লয়্যা সাজ সজ্জায়।
             [আবার] লয়্যা লয়্যা কহুরা দেখ্যা
                                      সাধের প্রাণ জড়ায়।।
             ১.       ওটে দধ রয়্যা, ঘি লয়্যা, লয়্যা খাবার পায়।
                      কেক, বিস্কট দিয়্যা ঠাকর ভোগ লাগায়।
             ২.       [ওটে] লয়্যা লয়্যা ঠাকরপোরা লয়্যা বৌদি পায়।
                       লয়্যা লয়্যা ঘাটে মাঠে লয়্যা হাওয়া খায়।
             ৩.      ছড়ি লয়্যা ছোড়া লয়্যা লয়্যা গান গাওয়ায়।
                      লয়্যা লয়্যা নাচে লয়্যা লহরা বেশ লাগায়।।
             ৪.       লয়্যা সভা লয়্যা জলসা লয়্যারা সব যায়।
                      লয়্যা লয়্যা বলি বল্যা লয়্যার মন সজ্জায়।।
     যোগেন্দ্রনাথ চৌধরী ওরফে মটর (১৮৯২-১৯৮৫) ঃ বিশ শতকের গোড়ার দিকে পশ্চিমবঙ্গের অমরনাথ ম-ল ও আবদল মজিদ গম্ভীরা গানের মল অভিনেতা ছিলেন। এর পরবর্তী প্রায় পাচ দশক ধরে ‘গম্ভীরা লোকনাট্যসম্ভবের’ অবিসম্বাদিত মখ্য অভিনেতা (উচিতবক্তা) ছিলেন যোগেন্দ্রনাথ চৌধরী ওরফে মটর।
     মটরের জন্ম ১৮৯২ সালে মালদহ জেলার ইংরেজ বাজার শহরের কতবপর বাব পাড়ায়। তার পিতার নাম স্বর্গীয় গণেশ চৌধরী, তারা জাতিতে মৎস্যজীবী (মহলদার)। মটরের শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টমান, পেশায় ছিলেন মালদা কোর্টের মহুরী।
     গম্ভীরাদলের সঙ্গে জড়িত হওয়ার আগে মটর মনসার গান (বিষহরি গান), আলকাপ ও খ্যামটার গান করতেন। গম্ভীরা গানের প্রতি আগ্রহী হয়ে প্রথমে তিনি অমরনাথ ম-লের দলে যোগদান করেন। পরবর্তীতে গোবিন্দ শেঠের দলে যোগদান করেন। কিন্তু দলনেতার মত্য হলে তিনি তারই জমজভ্রাতা গোপীনাথ শেঠের দলে যোগদান করেন। কিছদিন পর দলের সঙ্গে মতান্তর ঘটলে সেই দল ত্যাগ করে ১৯৬৬ সালে তিনি নিজে দল গঠন করেন। মটর ছিলেন ঘোর কষ্ণবর্ণের বিশাল বপ বিশিষ্ট। তার অঙ্গ-ভঙ্গিমা, অনায়াস-সিদ্ধ সংলাপ তাকে জীবদ্দশায় কিংবদন্তী-সমান শিল্পীরূপে অসাধারণ জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌছে দিয়েছিল। তার অভিনয় ভঙ্গিমা তথা ঈড়সরপ ফধহপব ষরশব চক্রাকারে ঘোরার ভঙ্গিমা পরবর্তী গম্ভীরা লোকনাট্যসম্ভবের মখ্য আঙ্গিক প্রকরণের অন্তর্ভক্ত হয়েছে। এখানেই মটরের কতিত্ব। মটর দেশ বিদেশে প্রায় সহস্রাধিক অনষ্ঠান করেছেন। তিনি সইস ব্রডকাষ্টিং কর্পোরেশন, ইরানীয়ান স্টাডিস ও কোলন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডকমেন্টারী চিত্রে রূপদান করেছেন। লাভ করেছেন ইন্সটিটিউট অব ককালচার আয়োজিত ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য কর্তক সংবর্ধনা (১৯৮১)। ভারতীয় গম্ভীরার এই কিংবদন্তীর নায়ক শিল্পী মটর ১৯৮৫ সালে পরলোকগমন করেন।
     মোহাম্মদ সফিউর রহমান ওরফে সফি মাস্টার (১৮৯৪-১৯৮৩)ঃ প্রখ্যাত গম্ভীরা রচয়িতা ও গম্ভীরা গানের আধনিক সংস্করণের জনক মোহাম্মদ সফিউর রহমান ওরফে শেখ সফিউর রহমান ওরফে সফি মাস্টার ১৮৯৪ সালে অভিভক্ত ভারতের মালদহ জেলার ইংরেজ বাজার থানার ফলবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মোহাম্মদ বেশারত।
     সফি মাস্টার মালদা জিলা স্কলে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করেন। পড়াশুনা ত্যাগ করেছিরেন নানান সমস্যার কারণে, তারপর যোগদেন ডাক বিভাগের পোষ্টম্যান পদে। চাকরীর পাশাপাশি তিনি সঙ্গীত চর্চা অব্যাহত রাখেন। সফি মাস্টার ছিলেন স্বভাব কবি। প্রথমে তিনি পালা গান, নিমাই সন্ন্যাস, রাধার মানভঞ্জন ইত্যাদি রচনা করেছেন। একসময় তিনি মালদহের খ্যাতনামা আলকাপ সরকার আকবর খলিফার আলকাপ দলে যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে কিশোরী মোহন চৌধরী ওরফে কিশোরী পন্ডিতের সম্ভীরা দলে যোগ দেন। শেষে তিনি নিজেই গম্ভীরা দল গঠন করেন। দেশ বিভাগ পর্বকালে তার পালা গম্ভীরা গানের প্রতিটি চরিত্র ছিল বটিশ বিরোধী। তার গম্ভীরা গানে স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনা লক্ষ্য করে বটিশ সরকার সফি মাস্টারের মাথার জন্য এক হাজার টাকা পরষ্কার ঘোষণা করেছিল।
     দেশ বিভাগের সময় ১৯৪৭ সালে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার বা Option নিয়ে শেখ সফিউর রহমান মালদহ থেকে রাজশাহীর চাপাইনবাবগঞ্জ মহকমার রহনপরে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এখানে এসে তিনি গম্ভীরা চর্চায় মনোনিবেশ করেন এবং পালা গম্ভীরাকে নানা-নাতির ভমিকায় রূপ দিয়ে ডয়েট আধনিক গম্ভীরায় নবরূপায়ণ করেন। এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় তিনজন ব্যক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপর্ণ ভমিকা পালন করেন। এরা হচ্ছেন- সোলেমান মোক্তার, কাল মোক্তার ও পশুপতি মোক্তার।
     পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী গম্ভীরা গানকে মোটেও পছন্দ করতো না। তাই ১৯৪৮-৪৯ চাপাইনবাবগঞ্জের তৎকালীন পাঞ্জাবি মহকমা প্রশাসক গম্ভীরা গানের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞাকে সফি মাস্টার উপেক্ষা করে গম্ভীরা গান পরিবেশন অব্যাহত রাখেন।
     গম্ভীরা গানে বন্দনা অংশে শিবকে উপস্থিত করিয়ে তাকে সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করে সফি মাস্টার যেমন কতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন, ঠিক তেমনি স্বাধীনোত্তর যগে ‘অপসন’-এ চাকরী নিয়ে পর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) চাপাইনবাবগঞ্জে এসে ইসলামীয় প্রভাবে দেবতা শিবকে পরিবর্তন করে ‘নানা-নাতি’-র Form তার অসাধারণ কতিত্ত্ব। অর্থাৎ অবিভক্ত ও বিভক্ত বাংলার আধনিক গম্ভীরা গানের আঙ্গিক প্রকরণের তিনিই স্রষ্টা। তাছাড়া হিন্দ-মসলিম উভয় সম্প্রদায়ের এক্যবোধ জাগরণে তার উদার মানসিকতা বিস্ময়কর।
     সফি মাস্টার রচিত ‘গম্ভীরা সঙ্গীত’ নামে একটি গম্ভীরা সংকলন মালদা থেকে বাংলা ১৩২৯ সনে প্রকাশিত হয়। এতে শিব বন্দনা, টাকা ও বিদ্যার বিবাদ, বাঙালি সৈন্যগণের মহাদেবকে সেনাপতিত্বে বরণ করে যদ্ধে আহবান, চাষার ছেলের স্কলে ভর্তি হবার কামনা, বটিশ সৈন্যের জয়, বিলাতি বাবদের প্রতি ভৎর্সনা, লাট দরবার ভোটে বিভ্রাট, দজন গ্রাম্য লোকের ডয়েত ইত্যাদি বিষয় উপস্থাপিত হয়েছিল।
     গম্ভীরা গান রচনার কতিত্ত্বের স্বীকতি হিসেবে অসংখ্য পরষ্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন সফি মাস্টার। তার গান শুনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকর প্রশংসা করেছেন। ১৯১৮ সালে কবিগুরু তাকে সোনার মেডেল উপহার দিয়েছিলেন পাবনা সাহিত্য সম্মেলনে। শুভেচ্ছা পেয়েছিলেন দিশবন্ধ চিত্তরঞ্জন দাশ ও নেতাজী সভাষ চন্দ্র বসর নিকট থেকে। জীবনের শেষভাগে ১৯৭৮ সালে তিনি রাজশাহী থেকে ‘মাদার বখ্শ সাহিত্য সংস্কতি পরস্কার’ এবং ১৯৭৭ সালে ‘উত্তরা সাহিত্য মজলিস পরস্কার’ লাভ করেন। আধনিক গম্ভীরা গানের রূপকার সফি মাস্টার ১৯৮০ সালে পরিণত বয়সে চাপাইনবাবগঞ্জ জেলার রহনপরে ইন্তেকাল করেন।

শেখ সফিউর রহমান ওরফে সফি মাস্টারের গম্ভীরা গানের নমনাঃ

                                          টাকা-বিদ্যা
                                      (ধন ও বিদ্যার কলহ)
             বিদ্যাঃ    বিদ্যানাম্ নরস্যপোধিকং প্রসন্নাহি গুপ্তধনম
                        বিদ্যা ভোগকারী যঃ সঃ সখকারী বিদ্যা গুরবে গুরু।।
                        বিদ্যা বন্ধ বিদেশ গমনে বিদ্যারাজস পজিতা।
                        নাই ধনবিদ্যা বিহীন পশু।
             টাকাঃ    টাকা ধর্মঃ টাকা স্বর্গঃ টাকাহি পরমং গুরু।
                        যস্য গহে টাকা নাস্তি হা টাকা হা টাকা সদা।
                        টাকার জন্য বিলাও গত্বা, সাহেব সাজে আদরং।
                        ধত্যাদিত্বাং পরিত্যক্তা কোট প্যান্টে সাজনম্।
                        হা টাকা হা টাকা করি বক চাপড়স্।
             উভয়েঃ  ভাইরে লাগল টাকা-বিদ্যায় বিষম দ্বন্দ্ব
                        সভায় বিচার কর কেডা বড় কে ভালমন্দ।।
             বিদ্যাঃ    স্বদেশে পজিত রাজা।
                        বিদেশে খায় পটল ভাজা।।
                        বিদ্বান লোকে জগতে পজ্য।
                        দেখ বিদ্যার মজা।।
                        বিদ্যা দেয় ধন, তই ছাড় টাকার ধন।
                        টাকা অভিমানী মর্খধনী, চোখ থাকতে অন্ধ।
             টাকাঃ    টাকা পরিযগে মান্য, টাকা রাজা বলে গণ্য,
                        ধন্য ধন্য টাকায় কত হয় ধর্ম পণ্য।।
                        টাকার জোরে বিদ্যা কিনি তোর
                        টাকা নইলে পারে সব কিছ বন্ধ।।
             বিদ্যাঃ    জগৎপজ্য সরস্বতী, বিদ্বানের কন্ঠে বসতি
                        আর্যভট্ট, নিউটন, কালিদাস প্রভতি।
                        বিদ্যা দেয় জ্ঞান-ধন জ্ঞানে হয় হরিসাধন
                        তার স্বাক্ষী রূপ-সনাতন স্বর্গবাসী হন।
                        টাকার মখ এইকালে, দঃখ পায় পরকালে
                        তরে যায় বিদ্যাবলে যত ভক্ত বন্দ।।
             টাকাঃ    শুধাও মসলমান হিন্দকে যতনে রাখে সিন্ধকে
                        লক্ষ্মী বলে পজে আমায় জগতের লোকে।
                        টাকা করে পাকা, মিউনিপ্যালিটির রোড
                        যায় নালায় গন্ধে।
                                          বন্দনা ১৯৪৫
                  (পশ্চিমা সভ্যতা গ্রাস করায় শিব ও দেবদেবীর অপমান)
                  তোমার এরূপ হতবদ্ধি দেব, মাথায় গজালো কেন।
                  বোধ হয় সিদ্ধি গুড়া ছেড়ে বিদেশীয় সরা করেছ পান।। (হর)
              ১. ইন্দ্ররাজার বজ্র কেড়ে, নরসাহেবের দিলা করে,
                  তাই হে টেলিগ্রাফের তারে পাই মোরা প্রমাণ। (হর)
              ২. দেখি চন্দ্রদেব নাইটে, জব্দ ইলেকট্রিক লাইটে।
                  বেধেছে বেশ আধে কাধে, নাহি পরিত্রাণ। (হর)
              ৩. ত্রেতাযগে পাই হে প্রমাণ, বাল্মীকি দেয় কশে প্রাণ দান।
                  তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ কলের গান, আমেরিকা প্রধান। (হর)
              ৪. দেবাদিদেব শন্যপথে, বেড়াতেন হে চেপে রথে।
                  সেই বিদ্যাটি ব্যোমযানে কর‌্যাছো যোগদান। (হর)
              ৫. পবন মধ্যে জাহাজের পালে, বরণ বাধ্য স্টিমার রেলে,
                  (আবার) বিলাতে টেমস্ নদীকলে বিশ্বকর্মার ধাম।
              ৬. ঋক, যদঃ, অথর্ব, সাম – এসব বেদের রাখনো না নাম।
                  (এখন) শিক্ষা দিচ্ছে স্টপিড ড্যাম, করে ইংলিশম্যান। (হর)
     ইন্দ্রদমন শেঠ (১৯০৫-১৯৮০): পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট গম্ভীরা রচয়িতা ইন্দ্রদমন শেঠ ১৯০৫ সালে মালদহ জেলার আইহো গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম নকড়ি শেঠ। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা মাইনর পাশ অর্থাৎ বর্তমান কালের অষ্টম মান। তিনি আইহো অঞ্চলে কর আদায়কারী ছিলেন।
     বাল্যকাল থেকেই তিনি সঙ্গীতের প্রতি অনরাগী ছিলেন। প্রাণের তাগিদে তিনি সামাজিক বিষয়ান্ত্রিত অসংখ্য গম্ভীরাগান রচনা করেন। মালদার আঞ্চলিক ভাষায় সতীশগুপ্তের পর তার শব্দচয়ন ও পদবিন্যাস স্বাতন্ত্র্যের দাবীদার। ইন্দ্রদমন শেঠ ১৯৮০ সালে পরলোকগমন করেন।
                       (বাংলার অধঃপতনের পরিপ্রেক্ষিতে লেখা গান)
                        হায়রে স্বাধীনতার ধারা। হায়রে স্বাধীনতার ধারা।
                        এখন ভাঙ্গ্যা চর‌্যা উর‌্যা পর‌্যা কনদিকে হবে খাড়া।।
              ১.       হিন্দ মোসলেম জেন খ্রীস্টান এক দরজা সব হলে,
                       দেখতে দেখতে কলির কান্ড ঘোর কলিতে পোল
                       ওরি মধ্যে থ্যাকা পর্ব-পশ্চিমবঙ্গ হ’ল সারা।।
              ২.      বাঙালী আর নয় বাঙালী, অবাঙালী নেতা,
                       তাদের চাপে, হাপে দাপে থৎনী থাতা,
                       পব-পশ্চিম বাঙালী এখন জিন্দাতে আধমরা।।
              ৩.      পব-পশ্চিম বাঙালী মিল্যা স্বরাজ আনলে মোর‍্যা,
                       হায়রে সে বাঙালী এখন সও হাত জলের তলে পোর‍্যা,
                       আবার অবাঙালী বাঙালীকে করলে লস্সি গাড়া।।
              ৪.      বিদ্যা বদ্ধি জ্ঞান বিজ্ঞানে দনিয়াৎ ছিল সেরা,
                       এখন সেই বাঙালী ঘোর কাঙালী ব্যাড়া জালে ঘেরা
                       চাকরী চাকরী কোর‌্যা পায়ে ধোর‌্যা হচ্ছে আত্মহারা।।
              ৫.     কোথায় সরেন, চিত্তরঞ্জন, কোথায় বঙ্কিম, রবি,
                      ওরে ক্ষদি আদি শহীদেরা আর বঙ্গের ছবি,
                      তোদের ধমনীতে তাদের রক্ত দ্যায় না কিরে সাড়া।।
              ৬.    জাগ্ বাঙালী ছাড় বাঙালী, উঠা কাচ্চি-পাক্কি,
                     ওরে বঙ্গভঙ্গ এক হোয়ে যাক, রেখে ধর্মসাক্ষী,
                     নইলে বাঙালীর স্থান নাই ভারতে হলি ছন্নছাড়া।।
     সৈয়দ মোহাম্মদ সোলেমান ওরফে সোলেমান ডাক্তার (জ.১৯০৮): গম্ভীরা গানের অন্যতম রূপকার সৈয়দ সোলেমান ওরফে মোহাম্মদ সোলেমান ওরফে সোলেমান ডাক্তার ১৯০৮ সালের ১৮ই মার্চ অবিভক্ত ভারতের মালদহ জেলার পরাতন মালদার (ওল্ড মালদা) জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মরহুম সৈয়দ ফাইমদ্দিন।
     সোলেমান ডাক্তার পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত অধ্যায়ন করেন। পেশায় ছিলেন চিকিৎসক। প্রথমে ইংরেজ বাজারের পড়াটলিতে হাজী ডাক্তারের ডাক্তারখানায় হাতে খড়ি। এই ডাক্তারখানায় এ্যালোপ্যাথি ও হোমিওপ্যাথি উভয় ওষধই দেয়া হতো। এখানে কিছকাল অবস্থান করে তিনি চিকিৎসা পেশায় অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তারপর চিত্তরঞ্জন বাজারের পাশে দোকান খোলেন। সেখান থেখেই ডাক্তার হিসেবে তার পরিচিতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৬২ সালে তিনি তৎকালীন পর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) চাপাইনবাবগঞ্জ মহকমা শহরে চলে আসেন।
     সোলেমান ডাক্তার একজন স্বভাব কবি ছিলেন। তিনি প্রায় সহস্রাধিক গম্ভীরাগান রচনা করেছেন। সামাজিক বিষয় অপেক্ষা দেশের রাজনৈতিক বিষয় সম্পর্কিত গম্ভীরা গান রচনায় তার অধিক আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। তার রচিত গানের অধিকাংশই আজ হারিয়ে গেছে। তিরিশের দশকে তার গানের বিকাশ ও সমদ্ধি ঘটে। প্রখ্যাত শিল্পী ও সঙ্গীত রচয়িতা বিশ্বনাথ পণ্ডিত তার দলে ছিলেন, পরে উভয়ের মধ্যে মতান্তর হওয়ার পর বিশ্বনাথ পণ্ডিত পথক দল গঠন করেন।
     বিশ্বযদ্ধোত্তর যগে ধর্মের বন্ধন মক্তি তথা রাজনীতি বিষয়ক গম্ভীরা গানে সফি মাস্টারে সঙ্গে সোলেমান ডাক্তার এক স্মরণীয় নাম। তাছাড়া অধনা বাংলাদেশে এসে চাপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে গম্ভীরা গানের প্রচার-প্রসারে তার অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরনীয়। সোলেমান ডাক্তার পরিণত বয়সে চাপাইনবাবগঞ্জ শহরে পরলোকগমন করেন। তার গানের নমুনা নিম্নে প্রদত্ত হলো।
              (ছেলের বাবা ও মেয়ের বাবা)
              ছেলের বাবঃ আগে সামলা নিজের বাড়ী
              দিস্ পরেরি দোষ, হয়ে বেহোস
              মেয়ে রেখে ধাড়ী।।
                           ১
              মেয়েরই, গুণ, কানা বেগুন
              জেনেও তার মাতা।
              ঘরে বসে আটা পিসে
              হয়ে ঢেকি যাতা।
              কেউ বলতে গেলে, ভাজা তেলে
              তারি ভাঙ্গে হাড়ি।।
                           ২
              সোনার চড়ি হাতে ঘড়ি
              চশমা এটে।
              খোপারই চল, জড়িয়ে ফল
              বাধে ঢেউ কেটে।
              ও ঘরে মতলব করে, ফ্যাসান ধরে
              ও পরে মার্কা মারা শাড়ী।।
                           ৩
              টকি দেখে, নাচ গান শিখে
              আরও কত কি।
              প্রাণ ঢেলে কাদে ফেলে
              খায় মাখন ঘি।
              বেড়ায় নৌকায় চড়ে, গুণ ধরে
              সমদ্রে দেয় পাড়ি।।
              মেয়ের বাবাঃ যাই তোর কথার বলিহারী
              সাফাই ঝেড়ে, মাথা নেড়ে
              দেখাও দোষ আমারি।।
                           ১
              ছেলেরা আজ পেয়ে স্বরাজ
              সেজে ধর্মা ষাড়।
              সাধ বেশে ঘরে এসে
              খজে মধর ভাড়।
              খেলে তাস পাশা, লয়ে আশা
              করে আড্ডা জারি।।
              মাসি পিসি, যে যার খশি
              সম্বন্ধ পেতে,
              আসে যায়, শুষে খায়
              রঙ্গেতে মেতে।
              চলে উজান ভাটা, ভলে ঘাটা
              সেজে ব্রহ্মচারী।।
                           ২
              লেখা পড়া, বিয়ে করা
              শিকেতে তলে,
              উড়ে ঝাকে ঝাকে, চাদের ফাকে
              ফটন্ত ফলে
              ঘরে বিলাসিতায়, চরম মাত্রায়
              হয়ে বেরোজ গাড়ী।।
     বিশ্বনাথ পণ্ডিত (১৯২০-২০০১): মালদহের প্রখ্যাত গম্ভীরা রচয়িতা বিশ্বনাথ পণ্ডিত ১৯২০ সালে মালদহ জেলার ইংরেজ বাজার থানার হাটখোলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম অমতলাল। পর্ব পরুষের আদিবাস বিহার হলেও প্রায় দশো বছর আগে মালদায় তাদের পরিবারের আগমন ঘটে।
     বিশ্বনাথের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও, তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত। তার পেশা ছিল মলত মৎশিল্প। প্রতিমাশিল্পী, পতল, সস্ ও ওয়েল পেন্টিং-এ ছিল তার অসাধারণ দক্ষতা। তিনি তৈরী করতেন বিচিত্র আকারের মাটির পতল ও টেরাকোটা পতল।
     গান ছিল বিশ্বনাথ পণ্ডিত রক্তে প্রবহমান। যখন তার বয়স ৭/৮ বছর ঠিক তখনই তার গান শুনে মগ্ধ হন গম্ভীরার অন্যতম রূপকার মোহম্মদ সফিউর রহমান ও ওরফে সফি মাস্টার। প্রথমে কষ্ণযাত্রার অভিনেতা হিসেবে সঙ্গীতাঙ্গনে পদচারণা শুরু করলেও তার বিকাশ ঘটে সফী মাস্টারের দলে যোগদানের ফলে। ১৯৩৭ সালে বিশ্বনাথ নিজেই একটি দল গঠন করেন।
     বিশ্বনাথ পণ্ডিত গম্ভীরা দলের গান লেখক (গম্ভীরা রচয়িতা) ছিলেন গোপাল দাস। পরবর্তীকালে সোলেমান ডাক্তারের গানও তার দলে পরিবেশন করা হতো। শেষ পর্যায়ে তিনি নিজেই সঙ্গীত রচনা শুরু করেন। ১৯৬০-৬২ সাল পর্যন্ত তার নিজস্ব দলের অনষ্ঠান হতো।
     পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে গম্ভীরা গান পরিবেশন করে খ্যাতি লাভ করেন বিশ্বনাথ। ১৯৪৮ সালে কলকাতায় গণনাট্য সংঘের উদ্যোগে অনষ্ঠিত গম্ভীরা উৎসবে তিনি সোলেমান ডাক্তারের বন্দনা দিয়ে আসর শুরু করেন। তার গান খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার ঋত্ত্বিক ঘটক, অভিনেতা উৎপল দত্ত, শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস প্রমখের অকন্ঠ প্রশংসা লাভ করেন। ১৯৯৩ সালে তিনি তার যোগ্যতার স্বীকতিস্বরূপ পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তক ‘লালন পরস্কারে’ ভষিত হন। ১৯৯৪ সালে মালদাহ অনষ্ঠিত জেলা গম্ভীরা উৎসব ও প্রতিযোগিতার আসরে তিনি সভাপতি ড. প্রদ্যোত ঘোষ ও জেলা শাসক কর্তক সম্মাননা লাভ করেন। ভারত সরকারের তথ্য ও সংস্কতি দপ্তর তার অবদানের স্বীকতি স্বরূপ সারা জীবন বার্ষিক বারো হাজার টাকা করে অনদান মঞ্জর করে বটে। কিন্তু তার মত্যর ৩/৪ দিন পর সে ঘোষণাপত্র তার পত্রদের হাতে আসে।
     বিশ্বনাথ পণ্ডিত অনন্য শ্রুতিধর এবং স্মতিধরও বটে। গানের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক দিকে তার পন্ডিত্য এ পর্যন্ত গম্ভীরার রাজ্যে মেলেনি। বিশ্বনাথ পণ্ডিতের গানের নমনা –
                                     আমের গান
              (দই আম বিক্রেতা-একজন ছেলে, অন্যজন মেয়ে)
              মেয়েঃ       বাব, বলি তোমার কাছে, ওধারে যেও পাছে
                            এখানেও আছে, নামকরা আম।
                            (তমি) লাওনা দেখ্যা শুন্যা
                            নিজের হাতে গুন্যা
                            একটাও পাবা না খজ্যা, সরা পচা
                            (কেবারে পচা)আম
              ছেলেঃ      বাব বড় কষ্ট কইরা, গাছের ওপর চইর‌্যা
                            এন্যাছি পাইর‌্যা, মালদইয়া আম।
                            (তমি) লাওনা না লাও, চাইখা দেইখা যাও
                            একে একে শুনাই কত রকম নাম।
                            ক্ষীরমোহন, মতিঝরণ, দিলসাজ, ক্ষীরসাপাতি,
                            বন্দাবনী, গোপালভোগ, দধিয়া, ভারতী,
                            লোহাজং, বেগমবাহার, দধকমোর, কয়াপাহাড়া,
                            আরাজনা, মিছরিকন, সরমাফজলী, ঘি কাঞ্চণ,
                            মোহনভোগ, লম্বাভাদরা, চকচকা, গুটিসিন্দরা,
                            বেলয়া, কেলয়া, আক্লমাটি,
                            জালিবান্ধা, হিল্সাপেটি,
                            সীতাভোগ, বদনাসোনারা,
                            রামপসিন, জিলাপিক্যারা,
                            বোম্বাই, সবজা, শৌল্ঢক্কা,

                            রুহিমন্ডা, চোঙা, হুক্কা,

              কালাপাহাড়, মনিরা, দিলবাহার, ফনিয়া,
              তোতামখি, শিয়ালখাউকি,
              ল্যাংড়া, গোলাপজাম।। (ধয়া)
              খটারিয়া, ধোকরিয়া, নাকয়া, তাবাকবসন
              করলাদাগি, কিষাণভোগ, গোলাপখাস, তালকন,
              মণিকাঞ্চন, কাচ্চামিঠা, কমড়াজালি, রসনপাতা,
              চিনিচাম্পা, মোহনবাশি, কালয়াদাগী, বারোমাসি
              জামানিয়া, সাওনিয়া, কাউয়াডিম্বি, মন্ডানিয়া
              আশ্বিনা, কর্মা, মধচকি
              গিধ্নী হাগ্গা, পানি লটকি
              রাখালভোগ, জহুরিয়া
              নবাব পসিন, কপরিয়া
              অমতভোগ, কোহিতর
              গৌড়জিতি, মোতিচর
              হিমসাগর, চোরসা, রঙবাহার, বাতাস
              চিড়াভিজা, কোসাকাঞ্চন,
              লখ্না, পতিরাম। (ধয়া)
     দোকড়ি চৌধরী (১৯২৭): ইংরেজবাজারের বাশবাড়ির দোকড়ি চৌধরী ছিলেন একজন গম্ভীরা সংগীত রচয়িতা ও গায়ক শিল্পী। যাদের জন্য গম্ভীরা সংগীত এখনও মালদহে আসন পেতে বসে আছে তাদের উত্তরসরী হচ্ছেন দোকড়ি চৌধরী। ১৯৬৫ সালে যোগেন্দ্রনাথ চৌধরী (মটর) যখন কতবপর গম্ভীরা দল ছেড়ে নতন দল তৈরি করেন, তখন দেবনাথ রায়ের (হাবলা) সঙ্গে তিনিও ছিলেন মটর দলের গম্ভীরা সংগীত রচয়িতা। গম্ভীরা সংগীত রচয়িতা ও গায়কশিল্পী হিসেবে তিনি মালদহের মানষের কাছে অতিপরিচিত। তিনি এখন গম্ভীরা সংগীতকে হাতিয়ার করে সামাজিক অন্যায়, অবিচার ও পীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছেন। দোকড়ি চৌধরী রচিত গম্ভীরা গানের নমনাঃ
              কি খাবিটে বহিন পাক্কা আম
              ধয়া রাখ্ সয়াদের চোপাখান।
              হামরা মালদোর লোক, গিল্ছিটে ঢোক
              বিশ টাকা কিলো আমের দাম
              সম্বছর আমের দিনে, কড়িয়ে কাত্তা আম বাগানে
              বাগদর চাখ্যা শিয়াল খাউকি, খ্যায়াছে সাপে পোকা ব্যাঙে
              আইজ উগলাউ মিলে না বহিন
              না চাখন একনা সরা আম।
              মাকই বাদামের ছাতয়া, খ্যায়ে ছিলাম মাখিয়্যা
              জ্যোষ্টি আষোঢ়, শাওন ভাদ্দর, খ্যায়াছি রশিয়্যা
              দেখেনি ভাতরুটির মখ, হায় রে কি সখ
              এ্যাখন খ্যাচে মিনিস্টার, চেয়ারম্যান।
              তাই কহি বহিনটে আম পেবি আর কনঠে
              গাড়ি গাড়ি চালান গেছে বিদ্যাশের বাজারে হাটে
              ভাইভাদর আসনা, সেও প্যাসনা
              লিসনা মখে আর আমের নাম।
     নির্মল দাস ওরফে নিরু (১৯২৯-২০০৫): পশ্চিমবঙ্গে প্রচলিত পালা গম্ভীরার অন্যতম প্রধান চরিত্র মখ্য অভিনেতা (উচিত বক্তা) হিসেবে যারা অনন্তকাল ধরে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন তাদের মধ্যে নির্মলদাস ওরফে নিরু অন্যতম।
     নির্মলদাসের জন্ম মালদহ জেলার ইংরেজবাজার থানার গয়েশপর গ্রামে ১৯২৯ সালে। তার পিতার নাম অঘোরনাথ। ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার পর তিনি মালদহ কোর্টের মহুরী হিসেবে কার্যক্রম শুরু করেন।
     ছোটবেলা থেকেই গম্ভীরা গানের প্রতি তার আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। প্রথমে তিনি দেবনাথ রায় ওরফে হাবল এবং বিশ্বনাথ পণ্ডিতের নিকট শিক্ষা গ্রহণ করেন। তারপর গোপীনাথ শেঠের দলে যোগদান করেন। দলের প্রধান অভিনেতা যোগেন্দ্রনাথ চৌধরী ওরফে মটরের সহযোগী নারী চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেন। মটর বাব পথক দল করলে নিরু গোপীনাথের দলের মখ্য অভিনেতা হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিনি সদীর্ঘ পঞ্চাশ বছর গম্ভীরা গানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। মটর বাবর সমসাময়িক যগে অন্যতম এবং মটর পরবর্তী নিরুই পশ্চিমবঙ্গের শ্রেষ্ঠ গম্ভীরা অভিনেতা এতে সন্দেহ নেই।
     নিরু কলকাতা দরদর্শন, আকাশবাণীর শিল্পী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে গম্ভীরা গান পরিবেশন করেন। এছাড়া বিভিন্ন অনষ্ঠানে তার উপস্থিতি ছিল সরব। ইনষ্টিটিউট অব ফোককালচার, মালদহ সম্মিলন ও কলকাতা স্মারক সম্মান সহ বিভিন্ন সম্মান ও সংবর্ধনা তিনি লাভ করেন। নির্মল দাস (নিরু) বর্তমানে মালদায় ইংরেজ বাজার থানায় কতবপর নয়াগ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।
     ডা. দেবপ্রসাদ সাটিয়ার (১৯৩১-২০০৫)ঃ প্রগতিশীল গম্ভীরাশিল্পী ও রচয়িতা ডা. দেবপ্রসাদ সাটিয়ার ১৯৩১ সালে অবিভক্ত বাংলার মালদহ জেলার ইংরেজ বাজার থানার গোলাপট্টিতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম স্বর্গীয় শঙ্করী প্রসাদ। তারা চার পরুষ ধরে গোলাপট্টিতে বসবাস করে আসছেন।
     দেবপ্রসাদের শিক্ষা জীবনের সচনা মালদহ শহরে। ১৯৪৮ সালে ম্যাট্রিকলেশন পাস করে কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজে আই.এস.সি’তে ভর্তি হন। আই.এস.সি পাসের পর কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে ১৯৫৬ সালে এম.বি.বি.এস পাশ করেন। কলকাতা পি.জি হাসপাতালে দ’বছর হাউস স্টাফ হিসেবে কাজ করার পর তিনি মালদহ ফিরে আসেন। ১৯৫৮ সাল থেকে তিনি ইংরেজ বাজারে চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত হন।
     পেশায় চিকিৎসক হলেও ছোটবেলা থেকেই সঙ্গীতের প্রতি ছিল তার অসীম আগ্রহ। মালদহ গম্ভীরার কেন্দ্রভমি তাই শৈশব থেকেই তিনি গম্ভীরার আবহাওয়ায় প্রতিপালিত হন। কলকাতা মেডিকেল কলেজে অধ্যায়নকালীন সময়ে তিনি বহু অনষ্ঠানে গম্ভীরা গান পরিবেশন করেন। ইংরেজ বাজারের এই খ্যাতিমান চিকিৎসক যেকোন অনষ্ঠানে গম্ভীরা গানের আমন্ত্রণ পেলে তা সানন্দে গ্রহণ করতেন। একসময় তিনি একটি গম্ভীরা দলও গঠন করেন।
     ডা. দেবপ্রসাদ সাটিয়ারের গম্ভীরা গানের ‘শিব হে’ নামের একটি ক্যাসেট প্রকাশিত হয়েছে। এতে তার ৮টি জনপ্রিয় গান স্থান পেয়েছে। গম্ভীরা ছাড়াও ১৯৯৭ সালে লঘ সঙ্গীতের সংকলন গ্রন্থ ‘সঙ্গীতাঞ্জলি’ প্রকাশিত হয়েছে।
     প্রতিভার স্বীকতি স্বরূপ দেবপ্রসাদ পেয়েছেন অনেক পরস্কার ও সম্মাননা। ১৯৯৪ সালে তিনি জেলাভিত্তিক গম্ভীরা প্রতিযোগিতার অনষ্ঠানে সংবর্ধনা ও আই.এম.এ (ও.গ.অ) মালদার গুণী সংবর্ধনা লাভ করেন।
     ডা. দেবপ্রসাদের গান অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ। তার গান সরস অথচ নির্ভীক, এমনকি নিজের শ্রেণীচরিত্র (ডাক্তার শ্রেণী) কেও আক্রমণে তিনি হতোদ্যম বিরত হননি। ২০০৫ সালে তিনি পরলোক গমন করেন। ডা. দেবপ্রসাদ সাটিয়ারের গম্ভীরা গানের নমনাঃ
              কলকাতা দর্শন ১৩৬০ বঙ্গাব্দ
   (গ্রাম্য টেপীর বাপের কলকাতা দর্শনের অভিলাষের কথা)
  ১.      চল টেপীর মা, হামরা দজনা ঘর‌্যা আসি কলকাতায়।
          রেল গাড়ীৎ চোড়্যা, যাবো দোড়্যা সাধ ছিল মনে বাড়াই।
  ২.     পান্তাভাতে নন পিয়াজ দিয়্যা ব্যাধা লে তই গামছাতে              লিয়্যা ওইঠে পথে-বিপথে ভিন-গায়েতে কি খাবো                    ভখের জ্বালায়।
  ৩.     ওইঠে পথে ঘাটে গুন্ডা কড়া জোর।
          পাছে পাছে ল্যাগতে পাবে তোর।
          রাখিস কড়া নজর, রাখ্ ব্যাধা তোর।
          ওই খট্টা হামার খট্টায়।
  ৪.     ওইঠে কালীঘাটে আছে জাগান কালী,
          মানত কর‌্যা দিব পাঠা বলি।
          বলবো চোখ তল্যা চা মা করালী
          নইলে বংশ খালি থ্যাকা যায়।
  ৫.     ওইঠে রাস্তা দিয়া চলে টেরাম গাড়ী
          ইনজিন নাই, ধয়ার নাই তারই।
          খালি টিক্কি দিয়্যা তারে তারে
          কেমনে কর‌্যা আগায়-পাছায়।
  ৬.     ওইঠে মরদ-মাইয়ার কোন তফাৎ নাই।
          একই সঙ্গে হেলতে-দলতে যায়।
          তোকেও কোরবো মডার্ণ হালের ফ্যাশান
          হাত ধর‌্যা খাবো হওয়ায়।
     কতবল আলম (১৯৩৬-১৯৯৯): বাংলাদেশের গম্ভীরা গানের কিংবদন্তীর শিল্পী কতবল আলমের জন্ম ১৯৩৬ সালের ২৩ জন চাপাইনবাবগঞ্জ শহরে। তার পিতার নাম আলহাজ্ব শামসর রহমান, বি.এ, বি.টি তিনি এজন শিক্ষাবিদ ও সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন।
     কতবল আলম বি.এ পর্যন্ত পড়লেও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেননি। কর্মজীবনে প্রবেশ করেন ১৯৬৫ সালে। প্রথমে সচিবালয়ে রিলিফ এন্ড বিহ্যাবিলিটেশান বিভাগের নিুমান সহকারি পদে চাকরি করেন। ১৯৬৩ সালে কষি তথ্য সংস্থায় মহকমা পর্যায়ে ‘মাঠ সংগঠক’ পদে যোগদান করেন। ১৯৬৭ সালে চাপাইনবাবগঞ্জ বদলী হয়ে আসেন। তারপর বিভিন্ন জেলায় চাকরি করার পর সহকারী কষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা হয়ে অবসর গ্রহণ করেন।
     একজন অভিনেতা হিসেবে তার সাংস্কতিক জীবনে সচনা। অভিনয় করেছেন অসংখ্য নাটকে। চলচিত্রেও তার ঘটেছে সরব পদচারণা। গম্ভীরা গানের হাতে খড়ি ১৯৪৯ সালে। ঐতিহ্যবাহী হরিমোহন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র থাকাকালীন সময়ে তিনি প্রথম গম্ভীরা করেন। ১৯৭৪ সাল থেকে আমত্য তিনি বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনে গম্ভীরা করেন। গম্ভীরা গানে ‘নানা’ হিসেবে অভিনয় প্রতিভায় জীবদ্দশায় তিনি প্রবাদ প্রতিম। লাভ করেছেন অসংখ্য পরস্কার ও সম্মাননা। এসব পরস্কারের মধ্যে রাজশাহী বরেন্দ্র একাডেমী বহত্তর রাজশাহী জেলা সমিতি, ঢাকা, নবাবগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমী, রাজশাহী সঙ্গীত ভবন, পদ্মা থিয়েটার, বাংলাদেশ ফোকলোর কেন্দ্র কর্তক প্রদত্ত সম্মাননা উল্লেখযোগ্য। তিনি দেশের বাইরেও গম্ভীরা পরিবেশন করেছেন। ১৯৯৪-৯৫ সালে তিনি ভারতের দিল্পী, কলকাতা, বর্ধমান, হলদিয়া, ডায়মন্ড হারবার প্রভতি স্থানে গম্ভীরা পরিবেশন করেন। গম্ভীরার এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী ১৯৯৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর ঢাকায় পরলোকগমন করেন।
     রকিবদ্দীন (১৯৪২-২০০৫)ঃ বাংলাদেশের গম্ভীরা গানের অন্যতম জনপ্রিয় শিল্পী (নাতি) রকিবদ্দীনের জন্ম ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মালদহ জেলার ফলকড়ি গ্রামে ১৯৪২ সালে। তার পিতার নাম সাবের আলী। দেশ বিভাগের পর তিনি পিতার সঙ্গে মালদহ থেকে চাপাইনবাবগঞ্জ চলে আসেন।
     রকিবদ্দীনের পিতা ছিলেন বিখ্যাত গম্ভীরা রচয়িতা (নতন আঙ্গিকের গম্ভীরা গানের রূপকার) শেখ সফিউর রহমান ওরফে সফি মাস্টারের ভাই। তিনি গম্ভীরা দলের সঙ্গে যক্ত ছিলেন। পিতার অনপ্রেরণা তাকে গম্ভীরা গানের প্রতি অনরক্ত করে তোলে। এককথায় বলা যায় গম্ভীরাগান উত্তরাধিকার সত্রে রকিবদ্দীনের রক্তে মিশে আছে।
     রকিবদ্দীন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছেন হরিমোহন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। ছাত্রাবস্থা থেকেই তিনি খেয়াল, ঠমরি ইত্যাদি গান গাইতেন, পাশাপাশি অভিনয় করতেন নাটকে। ১৯৭২ সালে তৎকালীন সমবায় মন্ত্রী মতিউর রহমান চাপাইনবাবগঞ্জ এলে তার সম্মানে গম্ভীরা গানের আয়োজন করা হয়। সেই গম্ভীরায় প্রথমবারের মতো নাতি হিসেবে আবির্ভত হন রকিবদ্দীন। তারপর আর পিছন ফিরে তাকানো নয়। ১৯৭২ সাল থেকেই বাংলাদেশ বেতারে গম্ভীরা পরিবেশন শুরু করেন। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের শিল্পী হিসেবে অন্তর্ভক্ত হন।
     ১৯৯৪ এর ১৮ ডিসেম্বর থেকে ১৯৯৫ এর ৬ জানয়ারি পর্যন্ত তিনি ভারতের দিল্লী, কলকাতা, বর্ধমান, হলদিয়া, ডায়মন্ড হারবার এ গম্ভীরা পরিবেশন করেন। কতবল আলমের মত্যর পর তিনি পর্যায়ক্রমে বীরেন্দ্রনাথ ঘোষ, মাহববল আলম ও সাইদর রহমানকে নানা করে দল গঠন করেন। তিনি ৬ নভেম্বর ২০০৫ চাপাইনবাবগঞ্জ শহরের বাসনিয়াপট্টির নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন।
     বৈদ্যনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৪২-২০০৪): পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় গম্ভীরা রচয়িতা ও শিল্পী বৈদ্যনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৪২ সালে হুগলী জেলার পোলবায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম অনাথ বন্ধ বন্দ্যোপাধ্যায়। তারা স্থায়ীভাবে মালদহের চাচলে বসবাস করে আসছেন।
     বৈদ্যনাথ Electronics Equpments Training College-এ শিক্ষা গ্রহন করেন। তারপর Murphy Company তে Service Engineer রূপে যোগদান করেন। কিছুকাল চাকরী করার পর Murphy Dealer হন। শেষে শিশুতীর্থ নামে একটি নার্সারী স্কুল স্থাপন করেন।
     গম্ভীরা গানের প্রতি বৈদ্যনাথের আগ্রহ শৈশব থেকেই। সেই অনরাগের কারণে তিনি যোগেন্দ্রনাথ চৌধরী (মটর) ও নির্মল দাস (নিরু) এর নিকট শিক্ষা গ্রহণ করেন। ষাটের দশক থেকেই তিনি আশেপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে গম্ভীরা গানের আমন্ত্রণ পেতে থাকেন। মালদার আঞ্চলিক ভাষায় গম্ভীরা গান রচনা ও নতন আঙ্গিকের স্রষ্টা হিসেবে খ্যাতিমান বৈদ্যনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৮৪ সাল থেকে শিশুশিল্পীদের গম্ভীরা গান রচনার তালিম দেয়া শুরু করেন। তার হাতে গড়া শিশুশিল্পী ঋক্ চক্রবর্তী ১৯৯৭ সালে অনষ্ঠিত মালদহ জেলা গম্ভীরা প্রতিযোগিতায় বড়দের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে সার্বিক অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ পরস্কার লাভ করেন। গম্ভীরা গানের ধারা প্রবাহকে চলমান রাখার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখায় ১৯৯৭ সালে মালদহ জেলা ততীয় গম্ভীরা প্রতিযোগিতা অনষ্ঠানে তিনি সংবর্ধনা লাভ করেন। গম্ভীরা গানের এই খ্যাতিমান শিল্পী ও রচয়িতা ২০০৪ সালে পরলোকগমন করেন। বৈদ্যনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গম্ভীরা গানের নমনাঃ
                  শিব-বন্দনা
              এ কোন ব্যাশেতে
              এ্যাসাছো নানা।।
              কোট-প্যান্টও পরোনি
              টাটা সমো চড়োনি
              ষাড়ে চ্যড়ে এ্যাসাছো নানা
              এ কোন ব্যাশেতে এ্যাসেছো নানা।
              বাঘ-ছালটা পিন্যাছো
              আখার ছাইটা ম্যাখেছো
              ত্রিশল হাতে এ্যাসেছো নানা।
              তমি স্যাকেলেই থ্যাকে গ্যালে নানা।।
              দ্যাখে বদলে দিচ্ছে যে জামানা।।
              মাষ্টারদের লিখতে হবে
              প্রাইভেট পড়াবো না
              নইলে আর বেতন পাবে না।।
              এ নিয়ম সম্মানের না অসম্মানের
              মগজে/ এটাই-খেলছে না।
              তমি কপাল-চোখটা খলে দ্যাখো নানা
              এদের ভস্ম করার যায় কিনা?
              নইলে ছ্যাচাই পালটাবে দনিয়া।।
     সিরাজল ইসলাম (জ.১৯৪২)ঃ বাংলাদেশের অন্যতম খ্যাতিমান গম্ভীরা রচয়িতা মোঃ সিরাজল ইসলাম ১৯৪২ সালে অবিভক্ত ভারতের মালদহ জেলার (বর্তমান বাংলাদেশের চাপাইনবাবগঞ্জ জেলা) নবাবগঞ্জ থানার বারঘরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। নবাবগঞ্জ শহরের হরিমোহন ইন্সটিটিউশন থেকে ম্যাট্রিকলেশন, নবাবগঞ্জ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট ও ডিগ্রি এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৫ সালে রংপর জেলার গাইবান্ধা থানার পলাশবাড়ী ডিগ্রি কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। তারপর বিভিন্ন সময়ে শিবগঞ্জ মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে এবং শাহ্ নেয়ামতল্লাহ কলেজের অধ্যাপক হিসেবে চাকরী করেন। তিনি বাংলাদেশ বেতার রংপর ও রাজশাহীর শিল্পী হিসেবে খ্যাতিমান। বর্তমানে তিনি রাজশাহী বেতারে স্পেশাল গ্রেডের রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী। তিনি তিন শতাধিক গম্ভীরা গান রচনা করেছেন। সিরাজল ইসলাম রচিত গম্ভীরা গানের নমনাঃ
              (ঢাকায় অনষ্ঠিত সার্ক সম্মেলনকে কেন্দ্র করে)
                       হে নানা সার্কের এ আসরে হে
                       আস্যাছি হামরা কয়জনা
                       গম্ভীরা গান দিয়া এখন
                       করব দ’কথা আলোচনা।
              ১.      শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াই
                       ভাবলেন দক্ষিণ এশিয়ায়
                       সার্বিক উন্নয়নের তরে
                       কাজে নামলেন উঠে পড়ে
                       অমর থাকলেন বিশ্ববাসীর হিয়ায়।।
              ২.      ভারত শ্রীলংকা ভটান
                       মালদ্বীপ নেপাল পাকিস্তান
                       চলবো মোরা সবে মিলে
                       সাথী হয়ে এক মিছিলে
                       তলে সবে একতার শ্লোগান।।
                       দারিদ্র্য অশিক্ষার শত্রু
                      এ সব না হঠাইলে চলবে না।।
              ৩.    সাতভাই চম্পা মোরা যত
                      থাকবো আপন ভায়ের মত
                      সখী পারুল ডাকবে শেষে
                     এগিয়ে যাব ভালবেসে
                     পার হইব বাধা শত শত
                     সার্ক চলিবে আলো হাতে
                     দেখাইবে সঠিক নিশানা।।
     মাহববল আলম (জ.১৯৫২)ঃ বাংলাদেশের গম্ভীরা গানের বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় শিল্পী নানা মাহববল আলম। চাপাইনবাবগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার দর্গাপর গ্রামে ১৯৫২ সালের ৮ জলাই তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সাদাতল ইসলাম। মাহববল আলম চাপাইনবাবগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে ১৯৮৩ সালে বি.এ পাশ করেন। তারপর শাহ্ নেয়ামতল্লাহ কলেজে গ্রন্থাগারিক হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৬ এ গ্রন্থাগার ও তথ্য বিজ্ঞান বিষয়ে ডিপ্লোমা করেন। মাহবব ছাত্র জীবন থেকে সংস্কতি অনরাগী। যখন তিনি ৪র্থ শ্রেণীর ছাত্র তখনই স্কলে গম্ভীরা গান করে সবাইকে মগ্ধ করেন। তবে গম্ভীরা গান অনশীলন শুরু করেন ১৯৮৪ সাল থেকে। শহরের বিশিষ্ট আলকাপ শিল্পী বীরেন্দ্রনাথ ঘোষকে নাতি বানিয়ে তিনি গম্ভীরা গাওয়া শুরু করেন। ১৯৮৬ সালে তার দল বাংলাদেশ বেতার রাজশাহীর তালিকাভক্ত হয়। বীরেন ঘোষকে নিয়ে তিনি বাংলা একাডেমী, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীসহ বিভিন্ন জাতীয় পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণে গম্ভীরা গান পরিবেশন করেন।
     বীরেন ঘোষের মত্যর পর কিছকাল তিনি রকিবদ্দীনের সঙ্গে গম্ভীরা জটি বাধেন। পরবর্তী সময়ে ২০০০ সালে তিনি ফাইজর রহমান মানি নামে তরুণ এক শিল্পীর সঙ্গে জটি বাধেন এবং অদ্যাবধি তার দলটি জেলার শীর্ষস্থানীয় দল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মাহবব-এর ‘চাপাই গম্ভীরা’ এ পর্যন্ত ছয় শতাধিক গম্ভীরা পরিবেশন করেছে, অর্জন করেছে ব্যাপক প্রশংসা। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কর্তক লাভ করেছেন পরস্কার ও সম্মাননা। এসব সম্মাননার মধ্যে রয়েছে-জাতীয় সাহিত্য পরিষদ পরস্কার, রোটারী ক্লাব সনদ, কতবল নানা স্মতি সংসদ সম্মাননা। মাহবব গম্ভীরা ছাড়াও বিভিন্ন ধরণের আঞ্চলিক গান পরিবেশন করে ইতোমধ্যে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছেন।
     হরিমোহন কন্ডঃ পশ্চিমবঙ্গের সাহাপরের প্রখ্যাত গম্ভীরা কবি হরিমোহন কন্ড। তার রচিত চাষীরূপে শিব একটি আধ্যাত্মিক গম্ভীরা। এখানে উক্ত শিববন্দনাটি উদ্ধত করা হল।
              শিববন্দনা (চাষীরূপে শিব)
              তমি হয়ে চাষী কাশীবাসী কেন কাশীশ্বর?
              তোমার কর্মক্ষেত্র এই ব্রহ্মা- ক্ষেত্র তব হর।।
              ব্রহ্মা যিনি বিষ্ণকমার, বীজবনানী মজর তোমার,
              কতই যে বীজ হয়নি সসার, ওহে গঙ্গাধর।
              মন আত্মা দই বলদ বেধে, কর্ম জোয়াল চাপিয়ে কাধে
              মায়ারজ্জ নাসায় ছেদে কতই না আর তাড়।।
              সখদঃখ দই শক্ত যোধা সেই জোয়ালে আছে থোতা।
              (তমি) আশালাঠি দিচ্ছ গোতা ওহে গিদম্বর।
              সষ্টি হতে লয় পর্যন্ত, চাষের কি হবে না অন্ত?
              (তমি) কিঞ্চিদপি হওয়া ক্ষ্যান্ত, ওহে বিশ্বেশ্বর।
              তব ক্ষেত্রে এ সংসার, দিনে দিনে হচ্ছে অসার
              হরিমোহন বলে ও সারাৎসার, সারবিতরণ কর।
     শরৎচন্দ্র দাসঃ শরৎচন্দ্র দাস পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার ইংরেজ বাজার এলাকার একজন খ্যাতিমান গম্ভীরা রচয়িতা। তার রচিত একটি গম্ভীরার প্রতিটি স্তবকের মধ্য দিয়ে তৎকালীন মালদহের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির উল্লেখযোগ্য কার্যকলাপের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। এখানে সেই গানটির কয়েকটি স্তবক উদ্ধত করা হলঃ
              কলেরা এসে শহরে দেখা দিল প্রায় ঘরে ঘরে
              কত বাচল কত মৈল কে তার খোজ করে।
              এই কলেরায় হারিয়েছি ভাই প্রাণের রাধিকারঞ্জন
              মহান্ত বলদের গিরি নিজের সখ পরিহরি,
              এনট্যান্স স্কল করতে দিতে চাইলে দালানবাড়ি
              কর্তপক্ষ হয়ে স্বপক্ষ করবেন কি আশা পরণ?
              চাচলের রাজা বাহাদর করেছেন কত দেশের অভাব দর
              নগরিয়া স্কলে অর্থ দিয়েছেন প্রচর
              (আবার) হিন্দ-মসলমান পায় রাজার দান
              করেছেন তিনি প্রজারঞ্জন।
              রজনী পণ্ডিত মশায় মালদহের উন্নতির আশায়
              সাহিত্য সভা গড়লে তিনি এ বদ্ধ দশায়।
              প্রবীন পেয়েছেন তার সরকারী নবীন কালীরঞ্জন।
              দশের তরে ভিখারী হামাদের বিপিন বিহারী
              কষি শিল্প শিক্ষা দিতে যত্ন করে ভারি।।
     বামনবিহারী গোস্বামীঃ বামনবিহারী গোস্বামী গোসাইবাড়ির বংশজাত একজন উচ্চশ্রেণীর গোসাই বামন, ধর্মপরায়ণ ব্যক্তি এবং একজন নামকরা গম্ভীরা কবি। তার গম্ভীরা সংগীতের মধ্যে রয়েছে একটা আধ্যাত্মিকতার ছাপ। এখানে তার রচিত আনমানিক ১৯০৩ সালের এক গম্ভীরা সংগীতের শিববন্দনা উদ্ধত করা হলঃ
              জয় জয় জগত্তারণ শম্ভ,
              শিবে গরজত গঙ্গা অম্ব
              সচারু কণ্ঠ যিনি সকম্ব
              লম্বিত তাহে রুদ্র মাল।
              কিবা অরুণাধর কন্দ বদন,
              হাস্যবদন শোভিত ভাল।।
              লম্বিত জটা লটা পট শিরে
              নয়ন যগল ঢল ঢল করে
              ধকধক জ্বরে ভাল সে অনল।
              কিবা কটিতে বেষ্টিত শোভা বাঘাম্বর-
              ত্রিভবন যিনি গতি মন্থর,
              তরিতে অপার ভব সাগর
              বামন মাগিছে ও পদ কেবল।।
     এখানে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের খ্যাতিমান কয়েকজন গম্ভীরাশিল্পী ও রচয়িতার সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও তাদের সষ্টিকর্মের নমনা তলে ধরা হলো। এছাড়াও অসংখ্য গম্ভীরা শিল্পী ও রচয়িতা পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে ছিলেন এবং আছেন। এখানে তাদের নাম তলে ধরা যেতে পারে−পশ্চিমবঙ্গের অমরনাথ মন্ডল, আশুতোষ ঘোষ, হরিবোল সাহা, কিন হালদার, কালয়া, বিশুয়া, বীরেন ঘোষ, তারাপদ সরকার, বিমল গুপ্ত, তপন হালদার ধরণীধর সাহা, গোপাল দাস, কিশোরী পণ্ডিত, ঠাকরদাস, মনোরঞ্জন দাস, গোলাম গুপ্ত, ব্রজলাল পসারী, বিপিন খলিফা, শশী ডাক্তার, ইমরৎ হোসেন চৌধরী, ভপেন সাহা, জীবন হালদার, মণালকান্তি রায়, হাজারী বসাক, ধর্মদাস মণ্ডল, গোষ্ঠ বিহারী বাণিজ্যা, নীলকণ্ঠ দাস, গদাধর মণ্ডল, শমীর খলিফা, বিষ্ণ প্রসাদ নাগর, ধনকষ্ণ অধিকারী, মত্যঞ্জয় শর্মা, শ্রীরূপ খলিফা, মধসদন খলিফা, বসন্ত মজমদার, গোপালচন্দ্র দাস, তাবণ খলিফা, রজনী সরকার, উপেন্দ্র কর্মকার, সদর্শন শেঠ, বিনয় গুপ্ত, কালীপদ গুপ্ত, গোপীনাথ শেঠ, রাম পণ্ডিত, দেবনাথ রায়, মত্যঞ্জয় হালদার, সধাকর দাস, তারাপদ লাহিড়ী, হরিদাস দাস, রাধানাথ কন্ড প্রমখ। বাংলাদেশের গম্ভীরা রচয়িতা ও শিল্পীরা হচ্ছেন−পশুপতি মোক্তার, ফজলর রহমান মোক্তার, অক্ষয়কমার পাল (লক্ষ্মীপাল), নাইমল হক, মকবল  হোসেন, শেখ লাল মোহাম্মদ, আফজাল হোসেন, অধ্যাপক আবদল গণি, নাজিম উদ্দীন নাজ, ফাইজর রহমান মানিক, বীরেন্দ্র নাথ ঘোষ, সাইদর রহমান, খাইরুল আলম, শিশ মোহাম্মদ, ওমর ফারুক, আয়েশ উদ্দীন, জিল্লার রহমান, বদ্ধ ডাক্তার, মনিমল হক, নজরুল ইসলাম, তাজিম সরকার, কমরুল হক, আবদস সালাম, আবদর রহমান সরকার, সঞ্জয় কমার, খাবির উদ্দীন, আব্দর রাজ্জাক, শাহজামাল, মনির খান, রাহেলা খাতন, সাবিনা ইয়াসমিন, শামীম হোসেন, শামসর রহমান মিলন, শরিফল আরম জয়েল, শামীউল হক শাওন, মোজাম্মেল হক, এ.কে.এম. আসিক ইকবাল পার্থ, স্বপন কমার প্রমখ উল্লেখযোগ্য।
     ঐতিহ্যবাহী লোকসঙ্গীত গম্ভীরা গানের শিল্পী ও রচয়িতাদের নিয়ে এখন পর্যন্ত তেমন কোন গবেষণা হয়নি। অথচ এই কতি শিল্পীরা সদীর্ঘকাল ধরে এই সঙ্গীত চর্চা তথা অনশীলন করে দেশ ও জাতির সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা তলে ধরেছেন। অনেক সমস্যার সমাধানও হয়েছে তাদের প্রতিবাদী সঙ্গীতের আবেদনের প্রেক্ষিতে। তাই হারিয়ে যাবার আগেই এই লোককবি-শিল্পীদের জীবনী ও সষ্টিকর্ম সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন।

 

সহায়ক সত্রঃ
১. হরিদাস পালিত, আদ্যের গম্ভীরা, জাতীয় শিক্ষা সমিতি, মালদহ, ১৩১৯
২. ড. প্রদ্যোত ঘোষ, লোকসংস্কতি: গম্ভীরা, পস্তক বিপণী, কলকাতা, ১৯৮২
৩. শামসজ্জামান খান, বাংলাদেশের লোক ঐতিহ্য, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৩৯১
৪. মাযহারুল ইসলাম তরু, বরেন্দ্র অঞ্চলের লোকসঙ্গীত, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ২০০২
৫. ড. প্রদ্যোত ঘোষ, লোকসংস্কতি ও গম্ভীরা, পস্তক বিপণী, কলকাতা, ১৪১০
৬. পলকেন্দ সিংহ, ফিরে চল মাটির গানে, প্রভাব প্রকাশনী, কলকাতা, ১৯৯৮
৭. শচীকান্ত দাস, গম্ভীরার অতীত ও বর্তমান, বইওয়ালা, কলকাতা, ২০০৭
৮. ড. প্রদ্যোত ঘোষ, গম্ভীরা, লোকসংগীত ও উৎসব: একাল ও সেকাল, পস্তক বিপণী, কলকাতা, ১৯৬৯
৯. মাযহারুল ইসলাম তরু, চাপাইনবাবগঞ্জের লোকসংস্কতি পরিচিতি, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৯৯
১০. হাবীব-উল-আলম (সম্পাদিত), বাংলা একাডেমী ফোকলোর সংকলন: ৬৭, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৯৫

Dr. Mazharul Islam Toru
+ posts

Dr. Mazharul Islam Toru is the Principal of Adina Fazlul Haque  Government College in the district of Chapai Nawabganj. He obtained a Ph. D degree in Bengali from Rajshahi University. He was the Head of the Bengali Department of the Nawabganj Government College in Chapai Nawabganj. He has authored many books including books on the liberation war and folk songs.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here